বহুরূপী
পুলিস ইনস্পেক্টর ওচুমেলভ[১] হেঁটে যাচ্ছিলেন বাজারের মধ্যে দিয়ে। গায়ে তাঁর নতুন ওভারকোট, হাতে পাটুলি এবং পিছনে এক কনেস্টবল। চুলের রঙটা তাঁর লাল, হাতের চালুনিটা ভর্তি হয়ে গেছে বাজেয়াপ্ত-করা গুজবেরিতে। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই...বাজার একেবারে খালি ক্ষুদে ক্ষুদে দোকান আর সরাইখানার খোলা দরজাগুলো যেন একসার ক্ষুধার্ত মুখ-গহ্বরের মতো দীনদুনিয়ার দিকে হাঁ করে আছে। ধারে কাছে একটি ভিখিরি পর্যন্ত দাঁড়িয়ে নেই।
হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘কামড়াতে এসেছ হতচ্ছাড়া, বটে? ওকে ছেড়ো না হে। কামড়ে বেড়াবে সে আইন নেই আর। পাকড়ো পাকড়ো! হেই!’
কুকুরের ঘ্যান ঘ্যান ডাকও শোনা গেল একটা। ওচুমেলভ সেদিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, পিচুগিন দোকানীর কাঠগোলা থেকে বেরিয়ে এসে একটি কুকুর তিন ঠ্যাঙে লাফাতে লাফাতে ছুটছে আর তার পেছু পেছু তাড়া করেছে একটি লোক, গায়ে তার মড়মড়ে ইস্ত্রির ছাপা কাপড়ের জামা, ওয়েস্টকোটের বোতাম সব খোলা, সারা শরীর ঝুঁকে পড়েছে সামনের দিকে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে লোকটা কুকুরের পিছনের পাটা চেপে ধরল। কুকুরটা আবার কেউ কেউ করে উঠল, আবার চিৎকার শোনা গেল, ‘পাকড়ো, পাকড়ো!’ দোকানগুলো থেকে উ'কি মারতে লাগল নানা তন্দ্রাচ্ছন্ন মুখ। দেখতে দেখতে যেন মাটি ফুঁড়ে ভিড় জমে উঠল কাঠগোলার কাছে।
কনেস্টবল বললে, ‘বেআইনী হল্লা বলে মনে হচ্ছে, হুজুর।’
ওচুমেলভ ঘুরে দাঁড়িয়ে দুমদুম করে গেলেন ভিড়টার কাছে। কাঠগোলার ফটকটার ঠিক সামনেই তাঁর নজরে পড়ল বোতাম খোলা ওয়েস্টকোট-পরা সেই মূর্তিটি দাঁড়িয়ে। ডান হাত উঁচু করে লোকটা তার রক্ত মাখা আঙুলখানা সবাইকে দেখাচ্ছে। তার মাতাল চোখমুখগুলো যেন বলছে, ‘শালাকে দেখে নেবো!’ আঙুলটা যেন তার দিগ্বিজয়েরই নিশান! লোকটাকে ওচুমেলভচেনেন—স্যাকরা খিউকিন্।[২] ভিড়ের ঠিক মাঝখানটায় বসে আছে আসামী, অর্থাৎ বর্জোই জাতের একটি বাচ্ছা কুকুর—চোখা নাক, পিঠের ওপর হলদে একটা ছোপ। সর্বাঙ্গ তার কাঁপছে। সামনের দুপা ফাঁক করে সে বসে, সজল দুই চোখে ক্লেশ আর আতঙ্কের ছাপ।
ভিড় ঠেলে ঢুকতে ঢুকতে ওচুমেলভ জিজ্ঞেস করলেন, ‘ব্যাপারটা কী? কী লাগিয়েছো তোমরা? আঙুল তুলে রেখেছিস কী জন্যে? চিল্লাচ্ছিল কে? কে চিল্লাচ্ছিল?’
খিউকিন মুঠো-করা হাতের ওপর একটু কেশে নিয়ে শুরু করলে, ‘আমি, হুজুর, হেঁটে যাচ্ছিলাম নিজের মনে, কারুর কোনো ক্ষেতি না করে। ওই তো ওই রয়েছে মিত্রি মিত্রিচ্—উর ঠেঁয়ে লকড়ীর দরকার ছিল হুজুর—তা খামকা, হুজুর, এই কুত্তার বাচ্ছাটা এসে কামড়ে দিলে একেবারে। বুঝুন হুজুর, মেহনত করে খেতে হয় আমাদের...আমার ব্যবসার কাজটিও তেমন সাদা-মাটা নয় হুজুর এর লেগে ক্ষেতিপুরণ করা করান উদিকে। যা গতিক তাতে আঙুলটি তো আর হপ্তাখানেক লড়াচড়া চলবে না। আইনে তো ইসব নাই হুজুর কি বুনো জানোয়ার-মানোয়ারদের সহ্য করতে হবে আমাদের? সব কিছুই যদি কামড়াতে লেগে যায় তবে জীবনে সুখ কী রইল, আজ্ঞা?’
‘হুম্! বটে! গলাখাঁকারি দিয়ে ভুরু কুচকে ওচুমেলভ বললেন কড়া সুরে, ‘বটে, আচ্ছা!... কার কুকুর এটা? এ আমি সহজে ছাড়ছি না! কুকুর ছেড়ে রাখার মজাই দেখিয়ে ছাড়ব! যেসব ভদ্রলোক আইন মেনে চলতে চান না তাঁদের ওপর মন দেবার সময় এসেছে। শালার ওপর এমন জরিমানা চাপাবো যে শিক্ষা হয়ে যাবে: যতো রাজ্যের গরু ভেড়া কুকুরকে চরতে ছেড়ে দেওয়ার মানে কী! কতো ধানে কতো চাল তা টের পাওয়াচ্ছি!’
কনেস্টবলের দিকে ফিরে ওচুমেলভ হাঁকলেন, ‘এলুদীরিন, তল্লাস লাগাও কার কুত্তা, আর একটা এজাহারও লিখে ফেলো। যা মনে হচ্ছে এ কুকুর ক্ষ্যাপা না হয়ে যায় না—ওটাকে সাবাড় করে ফেলা দরকার এখুনি! ...কার কুকুর এটা, জবাব দাও, কার, কুকুর?’
ভিড় থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘মনে হচ্ছে ওটা জেনারেল ঝিগালভের কুকুর!’
‘জেনারেল ঝিগালভ? হুম্!... এল্দারিন, আমার কোটটা খুলে দাও... উহ্ কি গরম! বোধ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments